

কক্সবাজারের উখিয়ায় দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সড়কে শৃঙ্খলা হীনতা। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন রোহিঙ্গা চালক, আর যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে উখিয়ার জনবহুল সড়কগুলো। ফলে যানজটের কবলে পড়ছে সাধারণ মানুষ, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যবস্থা।
২৮ আগস্ট সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ক্যাম্পে আবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও রোহিঙ্গাদের একটি অংশ স্থানীয় অসাধু মালিকদের সহযোগিতায় নিয়মিত সড়কে গাড়ি চালাচ্ছে। এসব চালকদের বেশিরভাগের নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, নেই কোনো প্রশিক্ষণ। এমনকি যেসব গাড়ি তারা চালাচ্ছে, তার অনেকগুলোরই নেই সড়ক চলাচলের উপযোগী ফিটনেস সনদ।
রোহিঙ্গা চালকরা ডান-বাম না বুঝেই বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। ট্রাফিক সিস্টেম বা পার্কিং নিয়ম সম্পর্কে তাদের নেই ন্যূনতম জ্ঞান। যার ফলে তারা সড়কের যত্রতত্র জায়গায় গাড়ি পার্ক করে রাখছে, এতে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের কোটবাজার, উখিয়া সদর, কুতুপালং, বালুখালী, থ্যাংখালীসহ একাধিক গ্রাম্য সড়কে অটো-টমটম (ব্যাটারি) সিএনজি, নসিমন, হরেক রকম ভ্যানের দাপটে এসব দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে অফিসগামী ও বিকালে স্কুল-কলেজ শেষে দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়ছেন হাজারো যাত্রী।
রোহিঙ্গারা নানা কৌশলে লোকালয়ে প্রবেশ করে সড়কে নৈরাজ্য চালাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন চাইলে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে বলে জানিয়েছেন এপিবিএন পুলিশের এএসপি জানে আলম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গাড়ি আছে সমস্যা নেই, এসব গাড়ি দক্ষ চালক বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানুষ কি না, কেউ তদারকি করছে না। ফলে দিন দিন রোহিঙ্গারা এসব গাড়ির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সড়কের যে নিরাপত্তা আছে তা বানচাল করে যাচ্ছে। এই রোহিঙ্গা চালকদের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেকে আতঙ্কে যানবাহনেও উঠতে চায় না। বিশেষ করে স্থানীয় চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) উখিয়া-টেকনাফের শীর্ষ নেতা আরফাত রহমান বলেছেন, উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন এলাকাজুড়ে ব্যাটারিচালিত টমটম, সিএনজি ও অটোরিকশা চালাচ্ছে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা। তাদের হাতে নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, সড়ক আইন মানার প্রবণতাও নেই। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ওঠানো এবং বেপরোয়া গতি—এসব কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।
একজন স্থানীয় দোকানদার জানান, আমরা নিজের এলাকায় এখন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারি না। রোহিঙ্গারা গাড়ি চালিয়ে এমনভাবে সড়কে উঠে পড়ে, যেন পুরো শহরটা তাদের।
সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা উখিয়া শাহপুরী হাইওয়ে থানার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা চালকদের বিষয়টি আসলেই অত্যন্ত মারাত্মক। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও রোহিঙ্গা চালকরা পুলিশ দেখলেই গ্রামীণ সড়কে ঢুকে লুকিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি আটক করা হলেও দেখা যায়, চালক পালিয়ে যায় আর মালিক মুচলেকা দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে কিছু জটিলতাও এখানে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় কিছু মুনাফালোভী পরিবহন মালিক আর্থিক লাভের আশায় রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে নিয়োগ দিচ্ছে চালক হিসেবে। শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে নিজেরা বেশি লাভবান হতে এই পথ বেছে নিয়েছে তারা। অথচ বিষয়টি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সড়কে গাড়ি চলাকালীন সময়ে রোহিঙ্গা চালককে দাঁড় করিয়ে কথা বলতে চাইলে সে বলে, এসব মালিক বুঝবে। মালিক কে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর বলে চলে যেতে চায়। তার নাম ও পরিচয় জানতে চাইলে বলে, সে কুতুপালং ১ নম্বর ক্যাম্পের একরাম উদ্দিন। সে ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং আশ্রয় নিয়েছে।
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হেলাল উদ্দিন বলেছেন, রোহিঙ্গারা অবাধে কাঁটাতার বের হয়ে লোকালয়ে এসে পড়ে, ফলে তারা এসবে সুযোগ পায়। প্রশাসন চাইলে এসব বন্ধ করা কোনো ব্যাপার না। শুধু গাড়ির ড্রাইভার নয়, যাবতীয় শ্রমবাজারে এখন রোহিঙ্গাদের দাপট চলছে।
উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। খুব শিগগিরই সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। রোহিঙ্গাদের গাড়ি চালাতে দেওয়া অবৈধ, সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।
পাঠকের মতামত